কলকাতার রাস্তার নিচে একটা নীরব বিপ্লব চলছে। ট্রাম, হলুদ ট্যাক্সি আর হাওড়া ব্রিজের ব্যস্ত শব্দের আড়ালে, মাটির গভীরে একটার পর একটা সুড়ঙ্গ আর ঝকঝকে স্টেশন তৈরি হচ্ছে — আর সেই নির্মাণই বদলে দিতে চলেছে কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন। ১৯৮৪ সালে যখন ভারতের প্রথম মেট্রো এই শহরেই চালু হয়েছিল, সেদিনের সেই ছোট্ট সূচনা আজ একটা বিশাল স্বপ্নের আকার নিচ্ছে।
অরেঞ্জ লাইনের কথাই ধরুন। নিউ গড়িয়া থেকে মেট্রোপলিটান পর্যন্ত মাত্র দশ কিলোমিটারে সীমাবদ্ধ থাকা এই ৩২ কিলোমিটারের রুটটি ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে পুরোপুরি চালু হয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। চিংড়িঘাটার ওপর দিয়ে মাত্র ৩৬৬ মিটারের একটা ফাঁক ছিল — কিন্তু প্রকৌশলীরা দুটো সপ্তাহান্তের রাতে গার্ডার বসানোর কাজ সেরে সেই ফাঁক পূরণ করেছেন। এই কাজ শেষ হলে কলকাতা পাবে তার ব্লু, অরেঞ্জ আর গ্রিন লাইনের একটি পূর্ণাঙ্গ শহুরে বলয় — যা ভারতের আর কোনো শহর এখনও পায়নি।
ইয়েলো লাইনের গল্পটাও অনেকটা রূপকথার মতো। গত বছরের ২২শে আগস্ট নোয়াপাড়া থেকে জয় হিন্দ বিমানবন্দর পর্যন্ত চালু হওয়া এই রুটে এখন প্রতিদিন ১২০টি ট্রেন চলছে। ভোর সাতটা আঠারো মিনিটে প্রথম ট্রেন ছাড়ে, আর রাত সাড়ে নটা পর্যন্ত পরিষেবা পাওয়া যায়। যেখানে এতদিন ভোরবেলা বিমানবন্দর ধরতে হলে উল্টাডাঙার জ্যামে বুক ভরে দুশ্চিন্তা নিয়ে বেরোতে হতো, এখন সেই যাত্রা এসি কামরায় বসে, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে।
পরিকল্পনা মানচিত্রে চোখ রাখলে মাথা ঘুরে যায়। মোট ৪৮টি নতুন স্টেশন তৈরির কথা রয়েছে — এর মধ্যে ১৯টির কাজ চলছে এখনই, আর ২৯টি পরিকল্পনার স্তরে। ব্যারাকপুর, বারাসাত, নিউ টাউন, এয়ারপোর্ট, জোকা — সব দিকে মেট্রোর হাত বাড়ছে। দিল্লি আর মুম্বাই পরিকাঠামোর গল্পে যে কলকাতাকে পিছিয়ে রেখেছিল, সেই কলকাতা এখন নিজের অধ্যায় নিজেই লিখছে — একটা একটা করে স্টেশন।
