কলকাতা : ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর আকার নিয়েছে। দলের একাংশের প্রকাশ্য বিদ্রোহ এবং পাল্টা শীর্ষ নেতৃত্বের কড়া অবস্থান ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দলীয় নেতৃত্ব, সাংগঠনিক বৈধতা এবং নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপই নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
সূত্রের খবর, বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একদল বিধায়ক ও সাংসদ বৈঠক করে ৩০ সদস্যের একটি জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের ঘোষণা করেছেন। ওই কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে হাওড়া সেন্ট্রালের বিধায়ক অরূপ রায়ের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, রথীন ঘোষ ও সাবিনা ইয়াসমিনকে সহ সভাপতি এবং সন্দীপন সাহা, বিপ্লব মিত্র, জাভেদ আহমেদ খান ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
বিদ্রোহী নেতৃত্বের বক্তব্য, তাদের উদ্দেশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দল থেকে সরানো নয়। বরং তাঁকে দলের অভিভাবক বা মেন্টর হিসেবে দেখতে চান তাঁরা। তবে সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে একক নেতৃত্বের পরিবর্তে সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে সওয়াল করেছে ওই গোষ্ঠী। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় মতামতের যথাযথ প্রতিফলন ঘটছে না।
অন্যদিকে বিদ্রোহীদের এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ অবৈধ বলে দাবি করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত শিবির। সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের কাছে ইতিমধ্যেই দলের অনুমোদিত ২৪ সদস্যের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে। ওই তালিকায় চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সহ সভাপতি পদে সুব্রত বক্সী, সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, যুগ্ম সম্পাদক পদে ডেরেক ও'ব্রায়েন ও দোলা সেন এবং কোষাধ্যক্ষ হিসেবে সুভাশিষ চক্রবর্তীর নাম রয়েছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ঘোষিত কমিটির কোনও সাংগঠনিক বা আইনি ভিত্তি নেই। সেই কারণেই দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে একাধিক নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। যাঁদের নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, অরূপ রায়, জাভেদ খান, রথীন ঘোষ, বিপ্লব মিত্র, স্নেহাশিস চক্রবর্তী এবং সাবিনা ইয়াসমিন।
সংকট মোকাবিলায় এর আগেই দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় রদবদল করা হয়েছিল। পুরনো কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্বকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে প্রদেশ সভাপতি এবং সায়নী ঘোষকে যুব সংগঠনের দায়িত্ব দিয়ে সংগঠনকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
বর্তমান সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমর্থনের প্রশ্ন। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, লোকসভার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংসদ এবং প্রায় ৬০ থেকে ৬৪ জন বিধায়ক তাদের পাশে রয়েছেন। সেই যুক্তিতে তারাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস এবং নির্বাচনী প্রতীকের উপর তাদের অধিকার থাকা উচিত বলে দাবি করছে।
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগতদের বক্তব্য, কোনও রাজনৈতিক দলের বৈধতা শুধুমাত্র নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যার উপর নির্ভর করে না। দলের সংবিধান, সাংগঠনিক কাঠামো, প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্ব এবং নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতিই এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের উপরই নির্ভর করবে।
প্রবীণ নেতা সৌগত রায়ও বিদ্রোহী শিবিরের দাবিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ। সূত্রের খবর, তিনি বলেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই দল গড়েছেন এবং যাঁরা আজ বিদ্রোহ করছেন তাঁদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে দলে যোগ দিয়েছিলেন। ফলে দলের মূল পরিচয় নিয়ে কোনও বিভ্রান্তির সুযোগ নেই বলেই তাঁর মত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার পর থেকে এত বড় অভ্যন্তরীণ সংকট আগে দেখা যায়নি। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে আগামী কয়েকদিনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং দুই শিবিরের সাংগঠনিক ও আইনি পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
