কলকাতার হৃদয়ে এক চিরন্তন শক্তিপীঠের গল্প
দক্ষিণ কলকাতার আদিগঙ্গার তীরে অবস্থিত কালীঘাট মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় তীর্থস্থান নয়, এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। একান্ন শক্তিপীঠের মধ্যে অন্যতম এই পীঠক্ষেত্রে দেবী পূজিতা হন দক্ষিণাকালী রূপে এবং ভৈরব হিসেবে আরাধিত হন নকুলেশ্বর মহাদেব।
সতীর পদাঙ্গুলির পৌরাণিক কাহিনি
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, সতীর দেহত্যাগের পর ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে তাঁর দেহখণ্ড বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বাস করা হয়, কালীঘাটে পতিত হয়েছিল সতীর ডান পায়ের একটি আঙুল। সেই কারণেই এই স্থান শক্তিপীঠের মর্যাদা লাভ করে। প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, এই অঞ্চল একসময় ‘কালীক্ষেত্র’ নামে পরিচিত ছিল। অনেক গবেষকের মতে, সেই নাম থেকেই পরবর্তীকালে ‘কলকাতা’ নামের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে।
সাহিত্য ও ইতিহাসে কালীঘাটের উল্লেখ
কালীঘাটের প্রাচীনত্বের পরিচয় মেলে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে। মনসামঙ্গল ও চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে এই তীর্থক্ষেত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থেও কালীঘাটের অস্তিত্বের কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে। জনশ্রুতি অনুসারে, ষোড়শ শতকের গোড়ায় শ্রীচৈতন্যদেব পুরী যাত্রার পথে এই অঞ্চলের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, অন্তত পাঁচশো বছর ধরে কালীঘাট একটি প্রতিষ্ঠিত তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।
মন্দির নির্মাণের ইতিহাস
প্রথমদিকে কালীঘাটে ছিল একটি সাধারণ উপাসনাস্থল। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন সাধক ও ধর্মপ্রাণ মানুষের উদ্যোগে এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, মাতৃসাধক আত্মারাম ব্রহ্মচারী ও ব্রহ্মানন্দ গিরির উদ্যোগে দেবীর বর্তমান মূর্তির রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরবর্তীকালে মন্দিরের সংস্কার ও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার। উনিশ শতকের গোড়ায় বর্তমান মন্দিরের কাঠামো নির্মিত হয় বলে প্রচলিত ধারণা। মন্দিরের পূজা ও সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিপুল পরিমাণ জমিও দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে দান করা হয়েছিল।
বহু মানুষের অবদানে গড়ে ওঠা তীর্থ
কালীঘাট মন্দিরের বিকাশ শুধুমাত্র একটি পরিবারের উদ্যোগে নয়, বিভিন্ন অঞ্চল ও সম্প্রদায়ের মানুষের সহযোগিতায় সম্ভব হয়েছে। নাটমন্দির, শিবমন্দির, নকুলেশ্বর মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে বহু দাতা ও ভক্তের অবদান রয়েছে। এই কারণেই কালীঘাট আজ সর্বভারতীয় ভক্তি ও আস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
আদিগঙ্গা ও কালীঘাট নামের উৎস
একসময় মন্দিরের পাশ দিয়েই প্রবাহিত হত হুগলি নদীর মূল ধারা। সময়ের সঙ্গে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান আদিগঙ্গার সৃষ্টি হয়। নদীর তীরে অবস্থিত ঘাটকে কেন্দ্র করেই ‘কালীঘাট’ নামের প্রচলন ঘটে। অনেক ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক মনে করেন, কালীঘাট ও কালীক্ষেত্র নামের বিবর্তনের সঙ্গেই কলকাতার নামের যোগসূত্র রয়েছে।
আজকের কালীঘাট
বর্তমানে প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত কালীঘাটে এসে দেবীর দর্শন করেন। বিশেষ করে মঙ্গলবার ও শনিবার ভক্তসমাগম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। পয়লা বৈশাখ, দুর্গাপূজা এবং দীপান্বিতা কালীপূজার সময় মন্দির প্রাঙ্গণ পুণ্যার্থীদের ভিড়ে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। দীপান্বিতা অমাবস্যায় দেবী এখানে মহালক্ষ্মী রূপেও পূজিতা হন।
বিশ্বাসের এক অমলিন কেন্দ্র
কিংবদন্তি, ইতিহাস, সাহিত্য এবং মানুষের অগাধ ভক্তি—এই চার স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে কালীঘাট। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও এই তীর্থক্ষেত্র আজও কলকাতার আধ্যাত্মিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান প্রতীক এবং শাক্ত উপাসনার এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে সমানভাবে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত।
