প্রতিষ্ঠার পটভূমি
দুর্গাপুর শহরের বেনাচিতি বাজারের প্রাণকেন্দ্রে, ভিরিঙ্গি গ্রামের শ্মশানভূমির পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক মন্দির — শ্রীশ্রী ভিরিঙ্গি শ্মশান কালীমাতার মন্দির। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে, অর্থাৎ বাংলা ১২৫৯ সনে, এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন সিদ্ধতান্ত্রিক গুরুদেব শ্রীশ্রী অক্ষয়কুমার রায়। দুর্গাপুর-১৩ অঞ্চলের এই মহাপুরুষ তন্ত্রসাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন এবং মায়ের উপাসনায় সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
মন্দির প্রতিষ্ঠার মহৎ উদ্যোগে অক্ষয়কুমার রায়ের সঙ্গী হয়েছিলেন বিহারের বক্সার থেকে আগত নাগবাবা তুলসীদাস গোঁসাই মহারাজ। নাগবাবার আগ্রহ ও ইচ্ছাতেই বাংলা ১২৫৯ সনে পঞ্চমুণ্ডির আসনে কালীমাতার মৃন্ময়ী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পঞ্চমুণ্ডির আসন — অর্থাৎ পাঁচটি মাথা দিয়ে গঠিত এই বিশেষ আসন — তন্ত্রশাস্ত্রে অত্যন্ত পবিত্র এবং শক্তিশালী বলে বিবেচিত।
ভিরিঙ্গি গ্রামের শ্মশানভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরটি মোট চার বিঘা জমির উপর বিস্তৃত। মন্দিরের বাইরে স্থাপিত বিশাল ত্রিশূলটি ভক্তদের কাছে আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। মন্দির প্রাঙ্গণে দেবী কালীর মূল মন্দির ছাড়াও রয়েছে মহাকাল ভৈরব বা শ্মশান ভৈরবের মন্দির, ত্রিগুণেশ্বর মহাদেবের মন্দির, সংকটমোচন শ্রীশ্রী হনুমানজির মন্দির এবং শ্রীশ্রী গণেশ মন্দির।
এর পাশাপাশি মন্দির চত্বরে রয়েছে নাগবাবার সিদ্ধাসন ও পঞ্চশূল, নাগবাবা এবং পূর্বপুরুষদের সমাধিমন্দির, নাট মন্দির যেখানে ধর্মীয় সংগীত ও পাঠপ্রবচন অনুষ্ঠিত হয়, একটি বিনামূল্যে ধর্মীয় পাঠাগার ও পাঠকক্ষ, যাত্রী আবাস বা ধর্মশালা এবং একটি দাতব্য ওষুধালয়। সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবাও এই মন্দির থেকে পাওয়া যায়।
ভিরিঙ্গি শ্মশান কালীমাতার সেবায়েত পরম্পরা সাণ্ডিল্য গোত্রের বন্দ্যোপাধ্যায় ব্রাহ্মণ পরিবারের হাতে সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্ঠাতা সিদ্ধতান্ত্রিক শ্রীশ্রী অক্ষয়কুমার রায়ের পর তান্ত্রিকাচার্য শ্রীশ্রী জগদীশচন্দ্র রায়, শ্রীশ্রী অবনীকান্ত রায় এবং গুরুদেব শ্রীশ্রী রবীন্দ্রনাথ রায় সমগ্র জীবন এই মন্দিরের সেবায় উৎসর্গ করে গেছেন। বর্তমানে এই মন্দিরের প্রধান সেবায়েত ও তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শ্রী সাধন কুমার রায় (বন্দ্যোপাধ্যায়)। তিনি কৈলাস-মানসরোবর থেকে কন্যাকুমারিকা, বাবা অমরনাথ থেকে মা কামাখ্যা পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থানে ভ্রমণ করেছেন।
প্রতি বছর অগ্রহায়ণ মাসের অমাবস্যায় মহানিশায় অনুষ্ঠিত হয় দেবীর বাৎসরিক পুজো ও মহোৎসব। এই উৎসবের রাতে পুরোনো মৃন্ময়ী মায়ের মূর্তি মন্দিরের পার্শ্ববর্তী কুমোরবাঁধে বিসর্জন দেওয়া হয় এবং নতুন মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। সারারাত ধরে হোম, যজ্ঞ, পুজো-অর্চনা এবং ধর্মীয় সংগীতানুষ্ঠান চলে। বাৎসরিক পুজোর দিনে এক লক্ষেরও বেশি ভক্ত সমবেত হন মন্দির চত্বরে এবং ৩০,০০০-এরও বেশি ভক্ত দেবীর প্রসাদ গ্রহণ করেন।
পুজোর অষ্টম দিনে অনুষ্ঠিত হয় 'অষ্টমঙ্গলা' উৎসব। সেই দিনে দেশ-বিদেশের প্রায় ২০,০০০ ধর্মপ্রাণ মানুষ ভোগপ্রসাদ গ্রহণ করেন। প্রতি মাসের অমাবস্যায় রাতেও ৫০০-র বেশি ভক্ত পুজো ও হোমের পর প্রসাদ পান। এই বিশাল আয়োজন সম্পূর্ণরূপে ভক্তদের স্বেচ্ছামূলক দানে পরিচালিত হয়।
দুর্গাপুরের সর্বাধিক জাগ্রত কালীমন্দির হিসেবে ভিরিঙ্গি কালীবাড়ির খ্যাতি সর্বজনবিদিত। মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা রয়েছে অসংখ্য দেব-দেবীর মূর্তি। ভক্তদের দৃঢ় বিশ্বাস, মায়ের কাছে মনের ইচ্ছা জানালে তা পূর্ণ হয়। এই বিশ্বাসের কারণে শুধু দুর্গাপুর বা বেনাচিতি নয়, সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ এবং দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভক্তরা এখানে আসেন। এমনকি বিদেশ থেকেও ভক্তরা এই পীঠে আসেন মায়ের আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে।
মন্দির কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে রেখেছেন যে মন্দিরের তরফে কোনো চাঁদা বা অনুদান সংগ্রহ করা হয় না। পুজো-হোম-যজ্ঞ, ভোগপ্রসাদ বিতরণ, দাতব্য কাজ, পুরোহিতদের বেতন এবং মন্দির রক্ষণাবেক্ষণ — সব খরচই ভক্তদের স্বতঃস্ফূর্ত দান থেকে নির্বাহিত হয়। 'সেবা পরম ধর্ম' — এই আদর্শেই পরিচালিত হয় এই মন্দির।
ভিরিঙ্গি শ্মশান কালীমন্দির কেবল একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি সমাজসেবী কেন্দ্রও বটে। দাতব্য ওষুধালয়, বিনামূল্যে পাঠাগার, যাত্রী আবাস এবং সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার মাধ্যমে মন্দির চত্বর থেকে মানুষের সেবা করা হয়। স্বামী বিবেকানন্দের 'যত্র জীব তত্র শিব' — এই মহান বাণীতে বিশ্বাসী এই মন্দির সংস্থাটি পশ্চিমবঙ্গ সমিতি নিবন্ধন আইন ১৯৬১-এর অধীনে নিবন্ধিত এবং আয়কর আইনের ৮০জি ধারায় দানের উপর কর ছাড়ের সুবিধাও প্রযোজ্য।
১৮৫২ সালে সিদ্ধতান্ত্রিক অক্ষয়কুমার রায়ের হাতে যে মন্দিরের সূচনা হয়েছিল, আজ সেই মন্দির দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে অটল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই মন্দিরের ছায়ায় বড় হয়েছে, বিপদে-আপদে মায়ের পায়ে মাথা নত করেছে। ভিরিঙ্গি কালীবাড়ি আজ শুধু বেনাচিতির নয়, সমগ্র দুর্গাপুরের আত্মপরিচয়ের অংশ। ইতিহাস, তন্ত্র, ভক্তি এবং সেবার এই অনন্য সমন্বয় এই মন্দিরকে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কালীপীঠের মর্যাদা দিয়েছে।
