বরোদা থেকে পণ্ডিচেরী: বিপ্লবী অরবিন্দের ঋষি হয়ে ওঠার ঐতিহাসিক যাত্রা


 
বিশেষ প্রতিবেদন : ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং আধ্যাত্মিক জাগরণের ইতিহাসে এক অনন্য নাম ঋষি অরবিন্দ ঘোষ। বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে দেশপ্রেম ও আধ্যাত্মিকতার যে বিরল সমন্বয় ভারতীয় সমাজে নতুন দিশা দেখিয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে গভীরভাবে শিক্ষিত হয়েও শেষ পর্যন্ত ভারতীয় দর্শন ও মানবচেতনার উন্নয়নের পথেই নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন অরবিন্দ।

১৮৯৩ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে ইংল্যান্ডে দীর্ঘ ১৪ বছরের প্রবাস জীবন শেষ করে তিনি ভারতে ফিরে আসেন। মাতৃভূমিতে ফিরে তাঁর প্রথম স্থায়ী ঠিকানা হয় বরোদা, বর্তমান বড়োদরা। বরোদার মহারাজা সায়াজিরাও গায়কোয়াড়ের আমন্ত্রণে তিনি প্রথমে রাজ্য প্রশাসনে এবং পরে বরোদা কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক ও উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন।
বাহ্যিকভাবে তিনি ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত আধুনিক এক তরুণ অধ্যাপক। কিন্তু অন্তরে তিনি খুঁজছিলেন ভারতের আত্মাকে। বরোদায় থাকাকালীনই তিনি গভীরভাবে বেদ, উপনিষদ, সংস্কৃত ভাষা ও ভারতীয় সংস্কৃতি অধ্যয়ন শুরু করেন। একই সময়ে তিনি গোপনে যুক্ত হন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও।
বরোদাতেই তাঁর জীবনে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বিপ্লবী জীবনের মানসিক চাপের মধ্যেই তিনি যোগসাধনার প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯০৮ সালে মহারাষ্ট্রের যোগী বিষ্ণু ভাস্কর লেলের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। লেলের নির্দেশনায় টানা তিন দিনের সাধনায় তিনি ‘নীরব মন’-এর এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভ করেন। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের ভিত গড়ে দেয়।
পরবর্তীকালে আলিপুর বোমা মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাবাসের সময় তাঁর চেতনায় আরও বড় পরিবর্তন আসে। জেলের নির্জনতায় তিনি উপলব্ধি করেন, কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, মানবজাতির অন্তর্গত চেতনার মুক্তিই তাঁর প্রকৃত লক্ষ্য।
১৯১০ সালে সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে এসে তিনি ফরাসি উপনিবেশ পণ্ডিচেরীতে আশ্রয় নেন। বরোদায় শুরু হওয়া সাধনার পথ পণ্ডিচেরীতে এসে পূর্ণতা পায়। প্রথমদিকে অল্প কয়েকজন অনুসারীকে নিয়ে তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন শুরু হলেও ১৯২০ সালে মীরা আলফাস্সার আগমনের পর সেই সাধনা এক নতুন রূপ লাভ করে। পরবর্তীকালে তিনিই ‘শ্রীমা’ নামে পরিচিত হন।
১৯২৬ সালের ২৪ নভেম্বর শ্রী অরবিন্দ আধ্যাত্মিক সিদ্ধি লাভের পর নিজেকে সম্পূর্ণ অন্তরালে নিয়ে যান। এরপর শ্রীমার পরিচালনায় আনুষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠে ‘শ্রী অরবিন্দ আশ্রম’।
এই আশ্রম ছিল প্রচলিত সন্ন্যাসধর্মের বাইরে এক নতুন ভাবনার কেন্দ্র। এখানে সংসার ত্যাগ নয়, বরং মানবজীবন ও সমাজকে দিব্যচেতনার আলোয় রূপান্তর করার দর্শনকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
একসময়ের বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ, যিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের পথে নেমেছিলেন, শেষ পর্যন্ত মানবচেতনার বিবর্তনের এক বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। বরোদা তাঁর সাধনার সূতিকাগার হলেও, পণ্ডিচেরীর আশ্রম সেই সাধনার মহীরুহে পরিণত হয়, যা আজও বিশ্বের অগণিত মানুষের কাছে আধ্যাত্মিক প্রেরণার উৎস।
Written By

Author

রিপাবলিকান মিরর (Republican Mirror) একটি শীর্ষস্থানীয় আধুনিক জনপ্রিয় নিউজ প্ল্যাটফর্ম।

Sponsored
Insert AdSense HTML Here

আরো খবর

Sponsored (300x250)