লাহিড়ী মহাশয় থেকে রজনীকান্ত-শাম্মী: মহাবতার বাবাজির অলৌকিক সান্নিধ্য ও দর্শনের রোমাঞ্চকর উপাখ্যান!




 হিমানী পঙ্কজ :মহা অবতার বাবাজি মহারাজ এক রহস্যময় এবং অমর যোগী হিসেবে পরিচিত। যোগী মহলে প্রচলিত বিশ্বাস ও বিভিন্ন আধ্যাত্মিক গ্রন্থ (বিশেষ করে পরমহংস যোগানন্দের 'যোগী কথামৃত' বা Autobiography of a Yogi) অনুযায়ী, যুগে যুগে বেশ কয়েকজন উচ্চকোটির সাধক ও সাধারণ মানুষ তাঁর দর্শন লাভ করেছেন।

​নিচে তাঁদের মধ্যে প্রধান কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলো:

​১. লাহিড়ী মহাশয় (শ্যামাচরণ লাহিড়ী)

​আধুনিক যুগে মহা অবতার বাবাজির প্রথম প্রকাশ ঘটে বারানসীর যোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ীর মাধ্যমে। ১৮৬১ সালে আলমোড়ার রানিখেতের দ্রোণগিরি পাহাড়ে লাহিড়ী মহাশয়কে বাবাজি মহারাজ নিজেই ডেকে নেন এবং তাঁকে পবিত্র 'ক্রিয়াযোগ' দীক্ষায় দীক্ষিত করেন। তিনিই বাবাজি মহারাজের অস্তিত্ব বিশ্বসমক্ষে তুলে ধরেন।

​২. স্বামী শ্রী যুক্তেশ্বর গিরি মহারাজ

​লাহিড়ী মহাশয়ের প্রধান শিষ্য স্বামী শ্রী যুক্তেশ্বর গিরি মহারাজ একাধিকবার বাবাজি মহারাজের দর্শন পেয়েছিলেন। এর মধ্যে এলাহাবাদের কুম্ভমেলায় এবং পরবর্তীকালে শ্রীরামপুরে তাঁর নিজ আশ্রমে বাবাজি মহারাজের আগমন ও দর্শনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাবাজি মহারাজের নির্দেশেই তিনি ‘দ্য হোলি সায়েন্স’ (কৈবল্য দর্শন) গ্রন্থটি রচনা করেন।

​৩. পরমহংস যোগানন্দ

​শ্রীযুক্তেশ্বর গিরি মহারাজের শিষ্য এবং 'যোগী কথামৃত' গ্রন্থের রচয়িতা পরমহংস যোগানন্দও বাবাজি মহারাজের দর্শন লাভ করেছিলেন। পাশ্চাত্যে যোগধর্ম প্রচার করতে যাওয়ার আগে, কলকাতার গুরুপার রোডের বাড়িতে বাবাজি মহারাজ তাঁকে দর্শন দিয়ে আশ্বস্ত করেন এবং তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য স্থির করে দেন।

​৪. মাতাজী (বাবাজি মহারাজের বোন)

​লাহিড়ী মহাশয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, বাবাজি মহারাজের এক আধ্যাত্মিক ভগিনী বা বোন রয়েছেন, যিনি ‘মাতাজী’ নামে পরিচিত। তিনি এবং বাবাজি মহারাজ বহু শতাব্দী ধরে একই তরুণ শরীরে বেঁচে আছেন এবং লাহিড়ী মহাশয় ও তাঁর কয়েকজন শিষ্যের সামনে মাতাজী উপস্থিত হয়েছিলেন।

​৫. রাম গোপাল মুজুমদার

​তিনি ‘ঘুমন্ত সাধু’ নামে পরিচিত ছিলেন। লাহিড়ী মহাশয়ের এই উচ্চপর্যায়ের শিষ্যটি দ্রোণগিরি পাহাড়ের একটি গুহায় বাবাজি মহারাজ এবং মাতাজী—উভয়েরই অলৌকিক দর্শন লাভ করেছিলেন।

​৬. স্বামী প্রণবানন্দ (মহাপ্রাণ)

​লাহিড়ী মহাশয়ের আরেকজন বিখ্যাত শিষ্য স্বামী প্রণবানন্দও বাবাজি মহারাজের দর্শন পেয়েছিলেন। তাঁর অভিজ্ঞতাও যোগানন্দের গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে।

​আধ্যাত্মিক বিশ্বাস: হিমালয়ের বদ্রীনাথ এবং দ্রোণগিরি অঞ্চলের গুহায় বাবাজি মহারাজ তাঁর একটি ক্ষুদ্র শিষ্যদলের সাথে অবস্থান করেন বলে ভক্ত ও যোগীরা বিশ্বাস করেন। তিনি কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছানো সাধকদের অথবা বিশেষ কোনো ঐশ্বরিক প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের সামনে দৃশ্যমান হন।


মহা অবতার বাবাজি মহারাজের কোনো ঐতিহাসিক বা চাক্ষুষ প্রমাণ সাধারণ মানুষের সামনে না থাকলেও, বিশ্বের বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, ক্রীড়াবিদ এবং চলচ্চিত্র জগতের সেলিব্রিটিরা তাঁর প্রতি গভীর ভক্তি প্রকাশ করেছেন। অনেকের মতে, তাঁরা সরাসরি বা আধ্যাত্মিক অনুভূতির মাধ্যমে (যেমন ধ্যান বা আলোর স্ফুলিঙ্গ রূপে) বাবাজি মহারাজের উপস্থিতি অনুভব বা ‘দর্শন’ করেছেন।

​এমনই কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব এবং সিনেমা আর্টিস্টদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

​১. রজনীকান্ত (সুপারস্টার)

​চলচ্চিত্র জগতের তারকাদের মধ্যে মহাবতার বাবাজির সবচেয়ে বড় এবং একনিষ্ঠ ভক্ত হলেন দক্ষিণী সিনেমার থালাইভা রজনীকান্ত।

​অনুভূতির বিবরণ: রজনীকান্তের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে পরমহংস যোগানন্দের 'যোগী কথামৃত' বইটি পড়ার সময় তিনি এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা লাভ করেন। বইয়ে থাকা বাবাজি মহারাজের ছবি থেকে একটি আলোর স্ফুলিঙ্গ (Light-spark) নির্গত হয়ে তাঁর শরীরে প্রবেশ করে।

​চলচ্চিত্রে প্রতিফলন: বাবাজি মহারাজের মহিমা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে রজনীকান্ত ২০০২ সালে 'বাবা' (Baba) নামে একটি সিনেমা তৈরি করেন। এই সিনেমাটির গল্প ও চিত্রনাট্য তিনি বাবাজির আশীর্বাদেই পেয়েছিলেন বলে দাবি করেন। তিনি নিয়মিত হিমালয়ের রানিখেতের কাছে অবস্থিত 'বাবাজি গুহা'-তে ধ্যানে বসেন।

​২. স্টিভ জবস (Apple-এর প্রতিষ্ঠাতা)

​অ্যাপল কোম্পানির প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস ভারতের আধ্যাত্মিকতার প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি পরমহংস যোগানন্দের শিক্ষার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁর আইপ্যাডে (iPad) একমাত্র যে বইটি ডাউনলোড করা ছিল, সেটি হলো 'Autobiography of a Yogi'। প্রতি বছর তিনি নিয়ম করে এই বইটি পড়তেন এবং বাবাজি মহারাজের ‘ক্রিয়াযোগ’ দর্শনে বিশ্বাস করতেন।

​৩. জর্জ হ্যারিসন ও দ্য বিটলস (The Beatles)

​বিখ্যাত ব্রিটিশ রক ব্যান্ড 'দ্য বিটলস'-এর সদস্যরা, বিশেষ করে জর্জ হ্যারিসন, ভারতের যোগী সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত ছিলেন। তাঁদের বিখ্যাত অ্যালবাম Sgt. Pepper's Lonely Hearts Club Band-এর কভারে তাঁরা পরমহংস যোগানন্দ, শ্রীযুক্তেশ্বর গিরি এবং লাহিড়ী মহাশয়ের সাথে মহাবতার বাবাজির ছবিও যুক্ত করেছিলেন। জর্জ হ্যারিসন বাবাজির শিক্ষার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বেশ কিছু আধ্যাত্মিক গানও তৈরি করেন।

​৪. বিরাট কোহলি (ভারতীয় ক্রিকেটার)

​ভারতীয় ক্রিকেট তারকা বিরাট কোহলি ও তাঁর স্ত্রী অনুষ্কা শর্মা দুজনেই পরমহংস যোগানন্দের অনুসারী। ২০১৭ সালে বিরাট কোহলি তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ায় 'যোগী কথামৃত' বইটির প্রশংসা করে পোস্ট করেছিলেন এবং জানান যে এই বইটি ও বাবাজি মহারাজের চেতনা তাঁর জীবন দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

​৫. বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী (বাংলার বিখ্যাত সাধক)

​চলচ্চিত্র জগতের বাইরের এক বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হলেন প্রভু বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী। উনিশ শতকের বাংলার এই মহান সমাজ সংস্কারক ও সাধক হিমালয় ভ্রমণের সময় সশরীরে মহাবতার বাবাজির দর্শন পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। বাবাজি মহারাজ তাঁকে একটি বিশেষ মহামন্ত্র প্রচারের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

​একটি বিশেষ প্রতীক: রজনীকান্ত তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে যে হাতের মুদ্রাটি (Apana Mudra) ব্যবহার করেন, সেটি মূলত মহাবতার বাবাজির ছবি থেকে অনুপ্রাণিত। যোগশাস্ত্রে এটিকে শরীর ও মনের বিষমুক্তকরণের মুদ্রা বলা হয়।

হিন্দি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা শাম্মী কাপুর-এর জীবন ও আধ্যাত্মিক যাত্রার সাথেও মহাবতার বাবাজি মহারাজের নাম অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। শাম্মী কাপুর কেবল বাবাজির ভক্তই ছিলেন না, বরং তিনি বাবাজি মহারাজের একনিষ্ঠ শিষ্য স্বামী হরিহরানন্দ সরস্বতী (যাঁকে ভক্তরা 'হৈদখান বাবা' বা 'হেরাখান বাবা' নামে ডাকতেন)-র চরণে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

​যোগ ও আধ্যাত্মিক মহলে বিশ্বাস করা হয় যে, এই হৈদখান বাবা আসলে মহাবতার বাবাজিরই আরেক রূপ (manifestation)। শাম্মী কাপুরের বাবাজি মহারাজের প্রতি এই আধ্যাত্মিক টানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে দেওয়া হলো:

​১. হৈদখান বাবার সান্নিধ্য ও দীক্ষা

​সত্তরের দশকে শাম্মী কাপুর যখন ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত কঠিন ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি উত্তরপ্রদেশের হেরাখান (হৈদখান) অঞ্চলে যান। সেখানে তিনি হৈদখান বাবার দর্শন পান। প্রথম দর্শনেই তিনি বাবার মধ্যে এক অলৌকিক ও দিব্য চেতনার সন্ধান পান এবং তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজেকে বাবার একজন সাধারণ সেবক মনে করতেন।

​২. গভীর আধ্যাত্মিক রূপান্তর

​হৈদখান বাবার আশ্রমে গিয়ে শাম্মী কাপুরের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে যায়। রুপোলি পর্দার চঞ্চল, রঙিন ও 'ইয়াহু' ইমেজের শাম্মী কাপুর পর্দার আড়ালে হয়ে ওঠেন অত্যন্ত শান্ত ও ধ্যানমগ্ন একজন মানুষ। তিনি নিয়মিত বাবাজির নাম জপ করতেন এবং হিমালয়ের আশ্রমের বিভিন্ন সেবামূলক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন।

​৩. চলচ্চিত্রের পর্দায় বাবাজির প্রতি শ্রদ্ধা

​শাম্মী কাপুর তাঁর অভিনীত এবং পরিচালিত ১৯৭৪ সালের বিখ্যাত ধর্মীয় চলচ্চিত্র 'মনরঞ্জন' (Manoranjan)-এর শুরুতে এবং তাঁর জীবনের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বাবাজি মহারাজের মহিমার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি হেরাখান আশ্রমের উন্নয়ন এবং বিশ্বজুড়ে বাবাজির বার্তা ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

​৪. ভক্তদের বিশ্বাস

​শাম্মী কাপুরের মতো বহু সাধক বিশ্বাস করেন যে, মহাবতার বাবাজি মহারাজ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপে (যেমন লাহিড়ী মহাশয়ের সময়ের বাবাজি, এবং পরবর্তীকালে হৈদখান বাবা) ভক্তদের কৃপা করার জন্য মর্ত্যে আবির্ভূত হন। শাম্মী কাপুর সেই অলৌকিক সান্নিধ্য ও আধ্যাত্মিক দর্শন লাভ করেছিলেন, যা তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁকে মানসিক শান্তি ও শক্তি জুগিয়েছিল।


Written By

Author

রিপাবলিকান মিরর (Republican Mirror) একটি শীর্ষস্থানীয় আধুনিক জনপ্রিয় নিউজ প্ল্যাটফর্ম।

Sponsored
Insert AdSense HTML Here

আরো খবর

Sponsored (300x250)