বাজপাই থেকে মোদি, দিল্লি থেকে নবান্ন: বিজেপির তিন দশকের রাজনৈতিক যাত্রা এবং বাংলার রায়



ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম বড় উত্থানের গল্প, পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের নতুন অধ্যায়

বিশেষ প্রতিবেদন : ভারতীয় রাজনীতিতে গত তিন দশকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) উত্থান নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অটলবিহারী বাজপাইয়ের নেতৃত্বে জোটনির্ভর রাজনীতি থেকে নরেন্দ্র মোদির সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতি এবং পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাজপাইয়ের বিজেপি: জোটনির্ভর, মানবিক ও মধ্যপন্থী রাজনীতি

১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত অটলবিহারী বাজপাইয়ের নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল। এই সময়ে জাতীয় সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এবং প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।

বাজপাই প্রমাণ করেছিলেন যে অ-কংগ্রেস সরকার পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারে না, এই ধারণা সঠিক নয়। ২২টি জোটসঙ্গীকে একসঙ্গে নিয়ে সফলভাবে সরকার পরিচালনা করা তাঁর অন্যতম বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে ধরা হয়। তাঁর আমলে অর্থনৈতিক নীতি এবং বিদেশনীতি উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

১৯৯৮-৯৯ সময়কালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও ভারত ৫.৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। একই সঙ্গে একাধিক রাষ্ট্রীয় সংস্থার বেসরকারিকরণ, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল এবং তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা এবং চিনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যার সমাধানে উদ্যোগও তাঁর সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের মধ্যে ছিল।

সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস, বিরোধীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সংযত রাজনৈতিক আচরণের জন্য বাজপাই আজও ভারতীয় রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে আছেন।

মোদির বিজেপি: সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতি ও উন্নয়নের দাবি

২০১৪ সালের ২৬ মে নরেন্দ্র মোদি ভারতের ১৪তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। প্রায় তিন দশকের জোট রাজনীতির পর বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে।

মোদি সরকারের আমলে জাতীয় সড়ক নির্মাণের গতি দৈনিক ৩৩ কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে বলে দাবি করা হয়, যেখানে পূর্ববর্তী সময়ে তা ৮ থেকে ১১ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের বিমানবন্দরের সংখ্যা ৭৪ থেকে বেড়ে ১৫৭-এ পৌঁছায়। একই সময়ে মেট্রো রেল পরিষেবা ২৫০ কিলোমিটার থেকে বেড়ে ২১টি শহরে ১,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত হয়।

পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) চালু করা, জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা বিলোপ এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশনের প্রসার মোদি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তবে সরকারের সমালোচকরাও বিভিন্ন সময়ে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বাজপাইয়ের সর্বদলীয় সমন্বয়ের রাজনীতির তুলনায় মোদির আমলে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান: প্রতিরোধ থেকে পরিবর্তন

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক উত্থান ছিল দীর্ঘ এবং বহুচর্চিত একটি প্রক্রিয়া।

২০২১: মমতার দুর্গ অটুট

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল জয়লাভ করে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা, বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং মহিলা ভোটারদের সমর্থন নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিজেপি ব্যাপক প্রচার চালালেও প্রত্যাশিত ফল পায়নি।

২০২৪ লোকসভা নির্বাচন: তৃণমূলের এগিয়ে থাকা

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গকে বিজেপির সম্ভাবনাময় রাজ্য হিসেবে দেখা হলেও ফলাফলে তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে থাকে। তৃণমূলের আসন সংখ্যা ২২ থেকে বেড়ে ২৯-এ পৌঁছায়, অন্যদিকে বিজেপির আসন সংখ্যা ১৮ থেকে কমে ১২-তে নেমে আসে। অধিকাংশ এক্সিট পোলের পূর্বাভাসের সঙ্গে চূড়ান্ত ফলাফলের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়।

২০২৬: ইতিহাসের পট পরিবর্তন

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ২০৬টি আসনে জয়লাভ করে এবং প্রায় ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটায়। রাজ্যে ভোটদানের হার ছিল ৯২.৪৭ শতাংশ, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অন্যতম উচ্চ ভোটদানের নজির হিসেবে উল্লেখ করা হয়। চূড়ান্ত ফলাফলে তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় ৮০টি আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ফলাফল শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের রাজনৈতিক মনোভাবের পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। দীর্ঘ বামফ্রন্ট শাসনের পর তৃণমূল কংগ্রেস এবং পরবর্তীতে বিজেপির উত্থান আবারও প্রমাণ করে যে পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা সময়ে সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিতে দ্বিধা করেন না।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই পরিবর্তনকে অনেকেই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনমতই শেষ পর্যন্ত রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেছে।

Written By

Author

রিপাবলিকান মিরর (Republican Mirror) একটি শীর্ষস্থানীয় আধুনিক জনপ্রিয় নিউজ প্ল্যাটফর্ম।

Sponsored
Insert AdSense HTML Here

আরো খবর

Sponsored (300x250)