গুয়াহাটি : আসামের গুয়াহাটির নীলাচল পাহাড়ের উপর অবস্থিত কামাখ্যা মন্দির ভারতের অন্যতম শ্রদ্ধেয় শাক্ত তীর্থ। প্রতি বছর আষাঢ় মাসে এখানে পালিত হয় অম্বুবাচী উৎসব, যা ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকসংস্কৃতি এবং প্রাচীন ঐতিহ্যের এক অনন্য সমন্বয় হিসেবে পরিচিত।
এই উৎসবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল টানা তিন দিন মন্দিরের দ্বার সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, এই সময় দেবী কামাখ্যা ঋতুমতী হন। তাই মন্দিরে দর্শন, পূজা এবং অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত থাকে। নির্দিষ্ট সময় শেষে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুনরায় খুলে দেওয়া হয় মন্দিরের দরজা।
‘অম্বুবাচী’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উর্বরতা ও প্রকৃতির নবজাগরণের ধারণা। বর্ষার সূচনালগ্নে পৃথিবী যেমন নতুন প্রাণশক্তি লাভ করে, তেমনই এই উৎসবেও ধরিত্রী মাতার সৃষ্টিশক্তির প্রতীকী প্রকাশ দেখা যায় বলে বিশ্বাস করা হয়। এই সময় বহু মানুষ বিবাহ, গৃহপ্রবেশ কিংবা নতুন কৃষিকাজের মতো শুভ কাজ থেকে বিরত থাকেন।
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, সতীর দেহত্যাগের পর বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে তাঁর দেহখণ্ড বিভিন্ন স্থানে পতিত হয়। জনবিশ্বাস অনুযায়ী, কামাখ্যায় দেবীর যোনিভাগ পতিত হয়েছিল। সেই কারণেই এই স্থানকে যোনিপীঠ বলা হয় এবং এটি একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে।
কামাখ্যা মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রচলিত অর্থে কোনো মূর্তি নেই। সেখানে একটি প্রাকৃতিক শিলাখণ্ড এবং নিরন্তর প্রবাহিত প্রস্রবণের জলকে দেবীর প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। অম্বুবাচীর সময় এই জলের রঙ লালচে হয়ে ওঠে বলে বহু ভক্তের বিশ্বাস। অন্যদিকে, কিছু গবেষকের মতে মাটির খনিজ উপাদান ও আয়রন অক্সাইডের প্রভাবে এমন রঙের পরিবর্তন ঘটতে পারে।
উৎসব উপলক্ষে মন্দিরে একটি সাদা কাপড় রাখা হয়, যা পরবর্তীতে লালচে আভা ধারণ করলে তাকে ‘অম্বুবাচী বস্ত্র’ বলা হয়। এই বস্ত্র ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয় এবং বহু মানুষ একে শুভশক্তির প্রতীক বলে মনে করেন।
অম্বুবাচীর সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু, তান্ত্রিক, অঘোরী এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলনকারীরা কামাখ্যায় সমবেত হন। পাশাপাশি সাধারণ ভক্তরাও প্রার্থনা, নামসংকীর্তন এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। ফলে নীলাচল পাহাড় পরিণত হয় এক বিশাল আধ্যাত্মিক মিলনক্ষেত্রে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অম্বুবাচী শুধু একটি ধর্মীয় আচার হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। লক্ষাধিক মানুষের সমাগমে এটি আজ আসামের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। দেশ-বিদেশের পর্যটক ও পুণ্যার্থীদের উপস্থিতিতে এই সময় গুয়াহাটি হয়ে ওঠে এক বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।
বিশ্বাস, ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি এবং আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধনে অম্বুবাচী আজও ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত।
