নয়াদিল্লি : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট এবার জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা পেল। রবিবার দিল্লিতে এক নাটকীয় রাজনৈতিক ঘটনায় তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া (NCPI)-তে যোগদানের ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তাঁরা প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্বাধীন NDA-কে সমর্থনের কথাও জানান।
সূত্রের খবর, লোকসভা স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে বিদ্রোহী সাংসদরা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে বৈঠকে বসেন। সেখানে তাঁদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। পরে তাঁরা লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সংসদে পৃথক আসনব্যবস্থার আবেদন জানান।
স্পিকারের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা ২০ জন সাংসদ, যারা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছি। আমরা স্পিকারের কাছে পৃথক আসনব্যবস্থার আবেদন করেছি। এই সংখ্যা আমাদের মোট সাংসদ শক্তির দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। আমরা ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে বিলয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং NDA-র অংশ হিসেবে কাজ করব।”
রাজনৈতিক মহলে আরও চাঞ্চল্য ছড়ায় যখন তৃণমূলের বর্ষীয়ান সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেন। ছয়বারের সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কে প্রকৃত তৃণমূল, সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আদালতই নেবে। আমরা জুলাই মাসে দলীয় নাম ও প্রতীকের দাবি জানাব। এরপর আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে।”
এদিকে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র সামাজিক মাধ্যমে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।
বিদ্রোহী শিবিরে কাকলি ঘোষ দস্তিদার, ইউসুফ পাঠান, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সায়নী ঘোষ-সহ একাধিক সাংসদের নাম রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সূত্রের দাবি, ১৯ জন সাংসদ সরাসরি স্পিকারের কাছে চিঠি জমা দিয়েছেন। সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় বিদেশে থাকায় লিখিত সম্মতি পাঠিয়েছেন। ফলে বিদ্রোহী সাংসদের সংখ্যা ২০-এ পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
NCPI একটি তুলনামূলকভাবে নতুন রাজনৈতিক দল। ২০২২ সালের শেষ দিকে ত্রিপুরাকে কেন্দ্র করে দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। ২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে সীমিত সংখ্যক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বড় কোনও জাতীয় উপস্থিতি না থাকলেও এই বিলয়ের ফলে দলটির সাংসদ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্রোহী সাংসদরা সরাসরি বিজেপিতে যোগ না দিয়ে কেন NCPI-র পথ বেছে নিলেন। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দলত্যাগ-বিরোধী আইনের সম্ভাব্য জটিলতা এড়াতেই এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসও পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে। সাংসদ কীর্তি আজাদ ও সাগরিকা ঘোষ স্পিকারের কাছে দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠি জমা দেন। সেখানে দাবি করা হয়, তৃণমূল কংগ্রেস একটি অবিভাজ্য রাজনৈতিক দল এবং সংসদের ভিতরে পৃথক গোষ্ঠী গঠনের প্রচেষ্টা সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
কীর্তি আজাদ বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ অতীতে স্পষ্ট করেছে যে কোনও রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে বিভাজনকে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না।”
ঘটনাকে ঘিরে আইনি বিতর্কও শুরু হয়েছে। রাজ্যসভার সদস্য ও প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিবল এই পদক্ষেপকে কটাক্ষ করে বলেন, “এটি এক অদ্ভুত রাজনৈতিক নাটকের মঞ্চায়ন।” তাঁর মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সাংসদদের অন্য দলে যাওয়া নিয়ে গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠতে পারে এবং দল চাইলে তাঁদের অযোগ্য ঘোষণার আবেদন জানাতে পারে।
এখন রাজনৈতিক ও আইনি মহলের নজর লোকসভা স্পিকারের সিদ্ধান্তের দিকে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন দলীয় নাম ও প্রতীক সংক্রান্ত কোনও দাবি গ্রহণ করে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর লোকসভায় এই সম্ভাব্য ভাঙন তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
