গৌরীক তীর্থ : দুর্গাপুর :
সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়েছে শহরের চেনা ছবি। বদলেছে মানুষের বিনোদনের মাধ্যমও। কিন্তু দুর্গাপুরের বহু মানুষের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল চিত্রালয় সিনেমা হল। একসময় যে প্রেক্ষাগৃহের সামনে নতুন ছবি দেখার জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ত, আজ সেখানে শুধুই নীরবতা। শেষ শোয়ের পর আর জ্বলেনি আলো। বন্ধ দরজার আড়ালে পড়ে রয়েছে এক সময়ের ব্যস্ত প্রেক্ষাগৃহের স্মৃতি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের স্মৃতিতে চিত্রালয় ছিল দুর্গাপুরের সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা। টিকিট কাউন্টারের সামনে ভিড়, হাতে ঝালমুড়ির ঠোঙা এবং নতুন ছবি দেখার উচ্ছ্বাস, সব মিলিয়ে বহু প্রজন্মের শৈশব ও কৈশোরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই সিনেমা হলের নাম।
চিত্রালয়ের পাশেই দীর্ঘদিন চায়ের দোকান চালাতেন সত্তরোর্ধ্ব মঙ্গল দাস। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চা, কেক, সিঙ্গারা ও চপ বিক্রি করেই সংসার চালাতেন তিনি। তাঁর স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট সেই সময়ের ছবি। নতুন ছবি মুক্তির দিন দর্শকদের ভিড়ে দোকানে দাঁড়ানোর জায়গা পর্যন্ত থাকত না বলে জানান তিনি।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালে উত্তম কুমার অভিনীত মহালগ্ন ছবির প্রদর্শনের মাধ্যমে চিত্রালয়ের পথচলা শুরু হয়। তখন সামনের সারির টিকিটের দাম ছিল ৭৫ পয়সা এবং বেলকনির টিকিট ২ টাকা ৮০ পয়সা। বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষার বিভিন্ন ছবি এখানে প্রদর্শিত হত। দুর্গাপুরের পাশাপাশি বর্ধমান, রানিগঞ্জ এবং আসানসোল থেকেও দর্শকরা সিনেমা দেখতে আসতেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
একসময় অবিভক্ত বর্ধমান জেলার অন্যতম জনপ্রিয় সিনেমা হল হিসেবে চিত্রালয়ের পরিচিতি ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। কলকাতার শক্তিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়, কানাই বোস এবং অনিল সরকার ডিএসপির কাছ থেকে লিজ নিয়ে প্রেক্ষাগৃহটি চালু করেছিলেন বলেও স্থানীয়দের বক্তব্য।
তবে সময়ের সঙ্গে চিত্রালয়ের পথচলায় একাধিক বাধা আসে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ১৯৮০ সালে ডিএসপির সঙ্গে মতবিরোধের জেরে হলটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এরপর ধীরে ধীরে প্রেক্ষাগৃহটির আগের জৌলুস কমতে শুরু করে।
১৯৯৮ সালে চিত্রালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। আগুনে হলের ভিতরের বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে অবশ্য ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে প্রেক্ষাগৃহটি। পরবর্তীকালে বর্ধমানের নটরাজ সিনেমা হলের মালিক শিবকুমার সাউয়ের হাতে চিত্রালয়ের মালিকানা যায় বলেও স্থানীয়দের দাবি।
এরই মধ্যে বদলে যেতে থাকে সিনেমা দেখার অভ্যাস। কেবল টেলিভিশনের প্রসার, মাল্টিপ্লেক্সের জনপ্রিয়তা এবং পরবর্তীকালে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থানে একক পর্দার সিনেমা হলগুলির অস্তিত্ব ক্রমশ সংকটে পড়ে। চিত্রালয়েও দর্শক সংখ্যা কমতে থাকে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় বাড়ায় প্রেক্ষাগৃহটি চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালে চিত্রালয়ের দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা রিতেন্দ্রনাথ বসুর স্মৃতিতেও এখনও জড়িয়ে রয়েছে চিত্রালয়ের সঙ্গে কাটানো বহু মুহূর্ত। বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে সিনেমা দেখার কথা মনে করে তিনি জানান, শেষ ছবি হিসেবে তাঁর স্মৃতিতে রয়েছে গুরুদক্ষিণা। তারপর আর চিত্রালয়ের পর্দায় আলো জ্বলেনি।
চিত্রালয় তাই শুধু একটি সিনেমা হলের নাম নয়। দুর্গাপুরের বহু মানুষের কাছে এটি এক সময়ের আবেগ, বন্ধুত্ব, আড্ডা এবং একসঙ্গে সিনেমা দেখার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি অধ্যায়। সময়ের স্রোতে প্রেক্ষাগৃহের দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও শহরের মানুষের স্মৃতিতে তার জায়গা এখনও অমলিন।
আজও চিত্রালয়ের সেই জায়গাটি স্থানীয়দের কাছে চিত্রালয় নামেই পরিচিত। পুরনো প্রেক্ষাগৃহের নীরব অস্তিত্ব তাই মনে করিয়ে দেয় দুর্গাপুরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়কে।
