হাজার হাজার সিএনজি ছুটছে শহরজুড়ে,পরিষেবা শূন্য! ট্যাঙ্ক পরিষ্কারে দুর্গাপুর থেকে আসানসোল ছুট


 গৌরীক তীর্থ , দুর্গাপুর


শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে এখন শুধু সিএনজি গাড়ির ভিড়। লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে অটো, স্কুলের খুদেদের ভরসা পুল কার কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ি। ইস্পাতনগরীর বুক চিরে দিনরাত ছুটে চলেছে সিএনজি গাড়িগুলি। কিন্তু আসল পরিষেবার বেলায় শূন্য দুর্গাপুর। শহরের মোড়ে মোড়ে সিএনজি পাম্প। অথচ যে দুর্গাপুরে হাজার হাজার সিএনজি গাড়ি রাস্তায় ছুটছে, সেই শহরেই নেই সিএনজি গাড়ির ট্যাঙ্ক পরিষ্কারের কোনও কেন্দ্র। আর তার জেরেই চরম ভোগান্তির মুখে পড়ছেন স্থানীয় চালকেরা। বাধ্য হয়ে স্রেফ ট্যাঙ্কি ধোয়ামোছা ও ফিটনেস সার্টিফিকেটের জন্য পাড়ি দিতে হচ্ছে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের আসানসোলে। দুর্গাপুর আরটিও-র তথ্য বলছে, শহরে বর্তমানে নথিভুক্ত থ্রি-হুইলার অটোই আছে প্রায় ১৬৪০টি, ৪ হাজারের বেশি প্রাইভেট গাড়ি ও অগণিত পুল কার রয়েছে। কিন্তু পরিকাঠামো আটকে সেই তিমিরেই।

দুর্গাপুরের অটোচালকদের কথাতেই ধরা পড়ল চালকদের নিত্যদিনের যন্ত্রণা।

অটোচালক দীনবন্ধু দাস বলেন, “প্রতি তিন বছর অন্তর ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করাতে হয়। খরচ পড়ে ২৬৫০ থেকে ২৭৫০ টাকা। তার উপর ওই দিনটার রোজগার বন্ধ। জাতীয় সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় ট্রাফিক পুলিশের চোখরাঙানি রয়েছে। কখনও কখনও পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ফাইনের খড়্গ ঝুলতে থাকে মাথায়।”

আরেক অটোচালক শ্যাম মন্ডল ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, "গাড়ির ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করাতে আসানসোলের চাঁদা মোড়ে যেতে হয়। ফলে সারাটাদিন সেখানেই চলে যায়। তার উপর জাতীয় সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় অনেক সমস্যা। দুর্গাপুরে একটা ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করার সেন্টার হলে ভালোই হয়।"

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অটোচালক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে বলেন, "কলকাতার গাড়িগুলি এলপিজিতে চলে আর এখানের গাড়িগুলো হচ্ছে সিএনজি। ফলে কলকাতায় গাড়ির ইঞ্জিন পরিষ্কারের খরচ হয়ত ৫০০ টাকা বা তার কম। তার থেকেও আশ্চর্যের বিষয় হল দুর্গাপুরে সিএনজি গ্যাস উৎপন্ন হলেও এখানে ১০২ টাকা কেজি দরে গ্যাস ভরাতে হয় অথচ দুর্গাপুরে উৎপন্ন সিএনজি গ্যাস উড়িষ্যাতে রপ্তানি করা হলেও সেখানে সিএনজি ৯০ থেকে ৯১ টাকা কেজি দর।"

তিনি আরোও অভিযোগ করেন, "এখন ই-রিক্সা কিনতে গেলেই ই-রিক্সার ট্যাক্স, ইন্সিওরেন্স, ফিটনেস, ড্রাইভিং লাইসেন্স, রুট পারমিট ইত্যাদির নামে গাড়ি পিছু অতিরিক্ত ২৫-৩০ হাজার টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে আরটিও অফিস থেকে এসব হচ্ছে। এই টাকা কে নিচ্ছে কি জন্য নিচ্ছে তার হিসেব নেই। আরটিও থেকে এটা পারমিটই বা করা হচ্ছে কেন?"

তিনি আরোও জানান, "আগের সরকারের আমলে দুর্গাপুরে সিএনজি গাড়ির ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করার সেন্টার বানানোর কথা বলা হয়েছিল। তখন রাজবাঁধের কাছে জায়গা পরিদর্শন করা হলেও পরে আর কোন উচ্চবাচ্য করা হয়নি।"

দুর্গাপুর অটো ইউনিয়নের সদস্য উত্তম দাসের দাবি, বহুবার কর্তৃপক্ষের কাছে দুর্গাপুরে ট্যাঙ্ক পরিষ্কারের কেন্দ্র তৈরির দাবি জানানো হয়েছে। তাঁর কথায়, “ইঞ্জিনে কার্বন জমলে মাইলেজ কমে, গাড়ির সমস্যা বাড়ে। অথচ পরিষেবা নিতে শহরের বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে চালকদেরই ক্ষতি।”

জেলা প্রাইভেট ট্রান্সপোর্ট কনভেনর, বিএমএস-এর প্রকাশ প্রসাদ জানান, চালকদের সমস্যা নিয়ে উচ্চতর নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। দুর্গাপুরে কেন্দ্র তৈরির জন্য বিধায়কদের কাছেও বিষয়টি জানানো হবে।

দুর্গাপুরের আরটিও আধিকারিক দেবাশীষ ঘোষ বলেন, “আসানসোলে থাকা এজেন্সিই ট্যাঙ্ক পরিষ্কারের সার্টিফিকেট দেয়। সেই সার্টিফিকেট ছাড়া পাম্পে সিএনজি দেওয়া হয় না। দুর্গাপুরে কেন্দ্র খোলার বিষয়ে এজেন্সির সঙ্গে কথা হয়েছিল। কিন্তু জমির দাম বেশি হওয়ায় তারা এখানে কেন্দ্র করতে রাজি হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”

অন্যদিকে দুর্গাপুর পূর্বের বিজেপি বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, দুর্গাপুরে সিএনজি ট্যাঙ্ক পরিষ্কারের কেন্দ্র তৈরির জন্য আরটিও-কে চিঠি দেবেন। এডিডিএ-র মাধ্যমে জমি খোঁজার উদ্যোগও নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

তবে প্রশাসনিক টানাপোড়েনের মাঝে পড়ে দুর্গাপুরের সিএনজি পরিবহণ আজ বড়ই অসহায়। এদিকে দূষণমুক্ত ভবিষ্যতের দোহাই দিয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে সিএনজি ব্যবহারে জোর দিচ্ছে সরকার। কিন্তু প্রশাসনিক উদাসীনতায় সেই বাহনই এখন চালকদের কাছে বোঝা। দূষণ কমানোর ডাক দিয়ে ঢাকঢোল পেটানো সহজ, কিন্তু তাকে টিকিয়ে রাখার ন্যূনতম পরিকাঠামোটুকু না গড়া স্রেফ দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।


--- ছবিতে কোন লেখা থাকবে না ক্লিয়ার ন্যাচারাল ইমেজ হবে ওয়েস্ট বেঙ্গল ইন্ডিয় মাথায় রাখবেন

Written By

Author

রিপাবলিকান মিরর (Republican Mirror) একটি শীর্ষস্থানীয় আধুনিক জনপ্রিয় নিউজ প্ল্যাটফর্ম।

Sponsored
Insert AdSense HTML Here

আরো খবর