বিশেষ প্রতিবেদন :
জন্মাষ্টমীর ইতিহাস, বিশ্বাস আর বাংলার কৃষ্ণসংস্কৃতির গল্প
কল্পনা করুন: মথুরার এক অন্ধকার কারাগার, চারদিকে প্রহরী, আর সেই কারাগারেই বন্দি এক রাজকন্যা জন্ম দিচ্ছেন এমন এক সন্তানের, যাঁর জন্মের খবর শোনার আগেই তাঁর মামা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। পুরাণ অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে, ঠিক মধ্যরাতে, দেবকী ও বসুদেবের অষ্টম সন্তান হিসেবে জন্ম নেন শ্রীকৃষ্ণ। এই একটি রাতের কাহিনি ঘিরেই গড়ে উঠেছে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব, জন্মাষ্টমী।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কৃষ্ণকে কেন ঠিক মধ্যরাতেই জন্ম নিতে হলো? পুরাণের বর্ণনায় সেই সময় ছিল অরাজকতা আর অত্যাচারের চরম পর্যায়। কংসের অত্যাচারে মথুরাবাসী তখন দিশেহারা। বিশ্বাস করা হয়, যখনই পাশবিক শক্তি সত্য ও ন্যায়কে গ্রাস করতে উদ্যত হয়, তখনই ঈশ্বর অবতাররূপে পৃথিবীতে আসেন ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। জন্মের রাতেই বসুদেব শিশুকে কোলে নিয়ে উত্তাল যমুনা নদী পার হয়ে গোকুলে যশোদা ও নন্দের কাছে রেখে আসেন। সেই যাত্রার দৃশ্য আজও কীর্তন-পালাগানে, চিত্রকলায় বারবার ফিরে আসে।
এখানে একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য জানা দরকার। কৃষ্ণের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ঠিক একরকম মত নেই। জন্মকাহিনি মূলত ধর্মীয় ও পুরাণিক ঐতিহ্যের অংশ, এবং বাংলাপিডিয়ার মতো নির্ভরযোগ্য সূত্রও কৃষ্ণের ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে এই মতভেদের কথা স্বীকার করে। তাই জন্মাষ্টমীকে বোঝার জন্য বিশ্বাস আর ইতিহাসকে আলাদা চোখে দেখাই বিজ্ঞানসম্মত।
জন্মাষ্টমীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এটি শুধু একটি জন্মদিন উদযাপন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভগবদ্গীতার এক গভীর দার্শনিক তত্ত্ব। গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে কৃষ্ণ নিজেই বলেছেন, ধর্মের অবক্ষয় আর অধর্মের উত্থানের সময়েই তিনি বারবার পৃথিবীতে আসেন। তাই ভক্তদের কাছে জন্মাষ্টমী শুধু স্মৃতিচারণ নয়, বরং ন্যায় আর নৈতিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক প্রতীকী উদযাপন।
আজ জন্মাষ্টমী পালিত হয় কীভাবে, জানলে অবাক হবেন। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে নাটক, নৃত্য আর রীতিমতো শারীরিক কসরত। ভাগবত পুরাণ অনুযায়ী কৃষ্ণের ছোটবেলার লীলা নিয়ে পরিবেশিত হয় রাসলীলা। আবার দহি হান্ডি প্রথায় অনেক উঁচুতে ঝোলানো মাখনের হাঁড়ি ভাঙার জন্য একদল মানুষ একে অপরের কাঁধে চড়ে মানব-পিরামিড তৈরি করে, তামিলনাড়ুতে একই রীতি পরিচিত উরিয়াদি নামে। মধ্যরাতে কৃষ্ণের জন্মমুহূর্তে ভক্তিগীতি গাওয়া, দিনভর উপবাস রাখা, আর ছোট্ট বালগোপালের মূর্তি স্নান করিয়ে দোলনায় সাজানো, এসবই এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাংলার প্রেক্ষাপটে জন্মাষ্টমীর গল্প আরও চমকপ্রদ, কারণ এখানে কৃষ্ণ শুধু পুরাণের বীর নন, তিনি একেবারে বাংলার নিজস্ব প্রেমকাব্যের নায়ক হয়ে উঠেছেন। চৈতন্যদেবের (১৪৮৬–১৫৩৩) জন্মেরও অনেক আগে, চতুর্দশ শতকে, বড়ু চণ্ডীদাসের লেখা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, বিরহ আর মানবিক আবেগের কথা বলা হয়েছিল। মজার তথ্য হলো, এই প্রাচীন পুঁথিটি হারিয়ে গিয়েছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী, বিশ শতকের গোড়ায় বাঁকুড়া অঞ্চলে আবিষ্কৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত।
তাহলে কি চৈতন্যদেবই বাংলায় কৃষ্ণভক্তির সূচনা করেছিলেন? উত্তরটা একটু জটিল। দ্বাদশ শতকে জয়দেবের সংস্কৃত কাব্য গীতগোবিন্দ এবং পরে চণ্ডীদাসের রচনা প্রমাণ করে, চৈতন্যের আগেই বাংলায় রাধা-কৃষ্ণকেন্দ্রিক কাব্যধারা বেশ শক্তিশালী ছিল। চৈতন্যদেব বরং নদিয়ার নবদ্বীপকে কেন্দ্র করে সেই বিদ্যমান ধারাকে নতুন সামাজিক শক্তি দিলেন। নামসংকীর্তন আর নগরকীর্তনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ভক্তিকে তিনি পরিণত করলেন সমবেত জনআন্দোলনে।
এবার এমন একটি তথ্য, যা অনেকেই জানেন না। ঢাকায় জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রার ইতিহাস প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৫৫৫ সালে একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রার সূত্রপাত হয়, আর ১৫৬৫ সালে কৃষ্ণজন্ম উপলক্ষে আরও সুসংগঠিত শোভাযাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। ঔপনিবেশিক আমলে এই শোভাযাত্রায় হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিম দর্শক ও অংশগ্রহণকারীদেরও উপস্থিতি দেখা যেত। ১৯৪৭-এর দেশভাগে এই ঐতিহ্যে বড় ছেদ পড়লেও ১৯৭১ সালের পর ঢাকায় জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা আবার নতুনভাবে ফিরে আসে।
কলকাতার ইতিহাসেও জন্মাষ্টমীর একটি চমকপ্রদ চিত্র-প্রমাণ রয়েছে। ঊনিশ শতকের কালিঘাট শিল্পধারায় রাধা-কৃষ্ণের ছবি আঁকা হতো, আর নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টের সংগ্রহে আজও সংরক্ষিত আছে প্রায় ১৮৭৮-৮৩ সালের কলকাতায় তৈরি এক 'Janmastami' লিথোগ্রাফ, যেখানে বসুদেব শিশুকৃষ্ণকে যমুনা পার করিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এই একটি ছবিই বলে দেয়, উনিশ শতকের কলকাতায় জন্মাষ্টমী শুধু মন্দিরের আচার ছিল না, বরং মুদ্রণ আর জনপ্রিয় নগরসংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছিল।
জন্মাষ্টমীর আরেকটি দিক আছে, যা উৎসবের ধর্মীয় সীমানা ছাড়িয়ে যায়। কলকাতার মোমিনপুরে প্রায় ছয় দশক আগে মহম্মদ কাশিম নামে এক মুসলিম সমাজকর্মীর উদ্যোগে জন্মাষ্টমী উদযাপন শুরু হয়েছিল, আর দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে এই আয়োজনে অংশ নিতেন। এই একটি ঘটনা প্রমাণ করে, বাংলার উৎসব-সংস্কৃতি কখনো কখনো ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে সামাজিক সম্প্রীতিরও ইতিহাস।
আজকের দিনে জন্মাষ্টমী কীভাবে পালিত হয়, তা প্রায় সবারই জানা। উপবাস, পূজা, মধ্যরাতের আরতি, আর দই-মাখন-মিছরির ভোগ। প্রতি বছর গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে মধ্য-আগস্ট থেকে মধ্য-সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনো একদিন, যখন ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমীতে রোহিণী নক্ষত্রের প্রাধান্য হয়, তখনই পালিত হয় এই উৎসব। কিন্তু এই তারিখ আর আচারের আড়ালে যে প্রায় পাঁচশো-হাজার বছরের সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা আর সামাজিক ইতিহাস লুকিয়ে আছে, সেটাই জন্মাষ্টমীকে নিছক একটি ধর্মীয় তিথির চেয়ে অনেক বেশি কিছু করে তোলে।
